৩য় সাংবাদিক : মি. প্রাইম মিনিস্টার, আপনি তাে আমার প্রশ্নগুলাে এড়িয়ে যাচ্ছেন? শেখ মুজিব : আমি কোথায় প্রশ্ন এড়ালাম? পরিস্থিতি ভালাে করে বােঝাবার জন্য আমি তাে শুধুমাত্র আপনাদের সুসভ্য দেশের সঙ্গে আমাদের দেশের আইন-শৃঙ্খলাজনিত পরিস্থিতির তুলনা করলাম মাত্র। ৩য় সাংবাদিক : এবার আমি আপনাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করতে চাই। শেখ মুজিব : আমি সানন্দে প্রশ্নের জবাব দিব। কিন্তু এটাই হবে আপনাদের শেষ প্রশ্ন। আমার জরুরি কাজ রয়েছে। ৩য় সাংবাদিক : মি, প্রাইম মিনিস্টার, আপনি “বিহারীদের ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নিয়েছেন? বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্যাম্পগুলােতে কয়েক লাখ ‘বিহারী পরিবার এখন যে নারকীয় অবস্থায় জীবন যাপন করছে, তা স্বচক্ষে দেখার জন্য আপনি ফুরসৎ পেয়েছেন কি? শেখ মুজিব : আপনি আমাকে একই সঙ্গে দুটো প্রশ্ন করেছেন। প্রথমটার উত্তর সােজা। এসব ‘বিহারিরা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর হিসাবে নির্বিচারে হত্যা, নারী ধর্ষণ, লুণ্ঠন এবং অগ্নিসংযােগের মতাে মানবতা বিরােধী কাজে লিপ্ত ছিল। তবুও স্বাধীন বাংলাদেশে এরা প্রাণে রক্ষা পেয়েছে। উপরন্তু এরা আন্তর্জাতিক রেডক্রশ-এর মাধ্যমে নিজেদের পাকিস্তানি নাগরিক হিসাবে দাবি জানিয়েছে। স্বাভাবিকভাবে এদের পুরাে দায়িত্বই হচ্ছে পাকিস্তান সরকারের। এখন সবার উচিত হবে, পাকিস্তান সরকারের উপর চাপ প্রয়ােগ করে বিহারীদের পাকিস্তানে ফেরৎ নেয়ার ব্যবস্থা করা।
দ্বিতীয়ত আপনি এদের ক্যাম্প জীবনের অবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন করেছেন। আমার তাে মনে হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও নিগ্রোরা সেদেশের বস্তিগুলােতে যেভাবে জীবন যাপন করছে, সে তুলনায় বাংলাদেশে বিহারীরা অনেক ভালাে আছে। কেমন কিনা? (মুচকি হেসে) আপনাদের সংবাদপত্রে আমার জবাবগুলাে হুবহু ছাপালে আমি খুশিই হব। ধন্যবাদ। মাত্র দিন কয়েকের ব্যবধানে আলােচ্য মার্কিনী সাংবাদিকদের প্রশ্নের বিষয় থেকে শুরু করে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার স্টাইল ও ধরনের সঙ্গে এ্যান্থনী ম্যাসকার্নহাস-এর প্রশ্ন ও স্টাইল-এর হুবহু মিল দেখে চমকে উঠলাম। তাহলে কি এসব সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর মধ্যে একটা গােপন যােগসূত্র রয়েছে? সাংবাদিক সাক্ষাৎকারের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে হঠাৎ করে ম্যাসকার্নহাসের চেহারার মধ্যে পরিবর্তন হলাে। মুহূর্তে বিলীন হলাে রাগান্বিত ভাব। চেহারায় উদ্ভাসিত হলাে এক অমায়িক হাসি। এবার কথােপকথন হচ্ছে নিম্নরূপ : ম্যাসকার্নহাস : মি. প্রাইম মিনিস্টার, আমি আপনাকে আর বিরক্ত করবাে না। আপনার সঙ্গে আমার মাত্র দু’মিনিটের একটা গােপন কথা রয়েছে। ঘর খালি হলে বলতে পারি। শেখ মুজিব : তথ্য দফতরের মহাপরিচালক এম. আর. আখতার মুকুল-এর সামনে আপনি নিশ্চিন্তে কথা বলতে পারেন। ওতাে আপনার পূর্ব পরিচিত; কেমন কিনা? আমাদের খুব বিশ্বাসী অফিসার। ম্যাসকার্নহাস : মুজিব ভাই, আপনি তাে জানেন গত বছর আমি বাংলাদেশের জন্য কী দুঃসাহসিক কাজ করেছি লন্ডনের সানডে টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত আমার এসব চাঞ্চল্যকর রিপাের্টের দরুন বিশ্ব জনমত বাংলাদেশের পক্ষে সােচ্চার হয়েছে। শেখ মুজিব : আমরা তাে আপনার এই অবদানের স্বীকৃতি বার বার করে যাচ্ছি। এখন বলুন, আপনার আসল বক্তব্য কী?
ম্যাসকার্নহাস : আপনি তাে জানেন, শুধুমাত্র এই একটি রিপাের্ট ছাপাবার উদ্দেশে আমাকে এতগুলাে ছেলেমেয়ে নিয়ে দেশত্যাগ করতে হয়েছে। আমি এখন বাস্তুহারা এবং ব্রিটেনে শরণার্থী। শেখ মুজিব : ১৯৪৭ সালে প্রথমবার ভারতের গােয়া থেকে করাচীতে এসেছেন। দ্বিতীয়বার ১৯৭১-এ করাচী থেকে লন্ডনে পাড়ি জমিয়েছেন। এখন বলুন আপনি আমার কাছে কী চান? ম্যাসকার্নহাস : সম্প্রতি পশ্চিম লন্ডনের শেফার্ড বুশ-এর কাছে একটা বাড়ি কেনার চেষ্টা করছি। এজন্য বহু অর্থের প্রয়ােজন। মুজিব ভাই, আমি আপনার কাছে হাজার বিশেক পাউন্ড চাচ্ছি। কথা দিচ্ছি এরপর কোনােদিনই আর আপনাকে বিরক্ত করবাে না। শেখ মুজিব : বলেন কী? বিশ হাজার পাউন্ড? মানে আমাদের প্রায় আট লাখ টাকা? আমি হচ্ছি একটা গরিব দেশের প্রধানমন্ত্রী? এখানকার অফিসারদের সর্বোচ্চ বেতন হচ্ছে মাত্র এক হাজার টাকা। আমি এতাে টাকা বৈদেশিক মুদ্রায় পাবাে কোথেকে? না, টনি আমার দ্বারা সম্ভব হবে না। আমাকে মাফ করতে হবে। ম্যাসকার্নহাস : বলছিলাম কি, গভর্নমেন্ট-এর তাে অনেক সিক্রেট ফান্ড থাকে। সেসব কোনাে ফান্ড…।। শেখ মুজিব : টনি, আমি দুঃখিত। গভর্নমেন্টের কোনাে ফান্ড থেকে এভাবে নগদ ২০ হাজার পাউন্ড দিতে পারব না। তবে ইংল্যান্ডের সিলেটীদের বিশেষ করে সেখানকার আওয়ামী লীগ সভাপতি গাউস খানকে অনুরােধ করতে পারি আপনাকে সাহায্য করার। ম্যাসকার্নহাস : মি, প্রাইম মিনিস্টার, লন্ডনে অন্তত এলাহাবাদ রেস্টুরেন্ট-এর মালিক গাউস খানের সাহায্যের দরকার হবে না। আপনাকে এভাবে বিরক্ত করার জন্য আমি দুঃখিত ধন্যবাদ।
এর মাত্র বছর তিনেক পরের কথা। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে আমি লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে সবে মাত্র প্রেস কাউন্সিলর-এর দায়িত্বে। এটা এমন এক সময় যখন বাংলাদেশে রুশ সমর্থকদের পরামর্শে সৃষ্ট ‘গণ ঐক্য জোট’-এর ব্যর্থতার পর এক দলীয় বাকশাল গঠনের তােড়জোড় শুরু হয়েছে। হাইকমিশনে যােগদানের পর স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিফিং নেয়ার সময় একটা গােপনীয় ফাইল থেকে জানতে পারলাম যে, “দি রেপ অব বাংলাদেশ’-এর লেখক এবং বিশিষ্ট সাংবাদিক এ্যান্থনী মাসকার্নহাসকে তার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের জন্য ‘অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ব অনুমতি ছাড়া দূতাবাস থেকে ভিসা ইস্যু করা যাবে না এবং রাষ্ট্রীয় কোনাে অনুষ্ঠানে ম্যাসকার্নহাসকে আমন্ত্রণ করা হবে না। দূতাবাস থেকেই জানতে পারলাম যে, বাংলাদেশের সরকার বিরোধী মহল ছাড়াও সম্প্রতি এ্যান্থনি ম্যাসকার্নহাস-এর নিবিড় সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে পাকিস্তানি লবির সঙ্গে। সত্যি কথা বলতে কি, মনটা আমার বিষন্নতায় ভরে উঠল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় যে এ্যান্থনি ম্যাসকার্নহাস একদিন নিজের ও পরিবারের জীবন বিপন্ন করে গণহত্যার রিপোের্ট সংগ্রহের পর বিশ্বের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশের মাধ্যমে দুঃসাহসিকতার নজীর স্থাপন করেছিলেন; সেই ম্যাসকার্নহাস তার প্রার্থিত বিশ হাজার পাউন্ড থেকে বঞ্চিত হয়ে ১৯৭৫-এ আবার গোপনে পাকিস্তানি এজেন্সির সঙ্গে যােগসূত্র স্থাপন করে বসে আছেন।
পাকিস্তানিদের কাছে ম্যাসকার্নহাস-এর মূল্য এখন অনেক বেশি। এখানেই শেষ নয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ভাের রাতে ঢাকায় যারা সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জড়িত এবং পরবর্তীকালে নানা ঘটনা প্রবাহে যাদের পরিবার লন্ডনে রয়েছে, এ্যান্থনী মাসকানহাস এ সময় হচ্ছেন তাদের স্থানীয় গার্ডিয়ান। এহেন এ্যান্থনি ম্যাসকার্নহাস ১৯৭৬ সালের আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে। লন্ডনের ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন’-এর ‘ওয়ার্ল্ড এন অ্যাকশন’ অনুষ্ঠানে ফারুক রশিদের চাঞ্চল্যকর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করলেন। কিন্তু কথা হচ্ছে, মুজিব হত্যার। মাত্র বছর খানেক সময়ের মধ্যে এভাবে হত্যার স্বীকৃতি দেয়া ছাড়াও ফারুকরশিদ কেন বললেন যে, হত্যাকাণ্ডের প্রস্তুতিকালীন অবস্থা সম্পর্কে জিয়াউর রহমান অবহিত ছিলেন। পরবর্তী সময়ের ঘটনা প্রবাহের মূল্যায়ন থেকে একথা বলা যায় যে, ১৯৭৬ সালের আগস্ট মাস নাগাদ আরও একটি অ্যুথান সম্পর্কিত প্রাথমিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছিল এবং সবার দৃষ্টি অন্যত্র ব্যস্ত রাখার লক্ষ্যেই বহু ঢাকঢােল পিটিয়ে আলােচ্য টিভি সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা হয়েছিল। এবার সৈয়দ ফারুক রহমান-এর কথা। এর আদি নিবাস উত্তরাঞ্চলের রাজশাহীতে। পিতা মেজর সৈয়দ আতাউর রহমান ছিলেন পাকিস্তান সেনা বাহিনীর ডাক্তার। অবিভক্ত ভারতে ইংরেজ রাজত্বের অন্তিম সময়ে যখন সমগ্র উপমহাদেশ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রক্তাপুত; সেই ১৯৪৬ সালে ফারুকের জন্ম। পিতার সম্মতিক্রমে তিনি ১৯৬৫ সালে সামরিক বাহিনীতে যােগদান করেন এবং পাকিস্তানের রিসালপুর মিলিটারি একাডেমিতে তার প্রশিক্ষণ সমাপ্ত হয়। এ সময় তার শিক্ষকদের অন্যতম ছিলেন দুজন বাঙালি অফিসার যথাক্রমে মেজর জিয়াউর রহমান এবং মেজর খালেদ মােশাররফ।

১৯৭০ সাল নাগাদ শিয়ালকোটে ৩১তম ক্যাভেলরি-তে থাকাকালীন সৈয়দ ফারুক ক্যাপ্টেন পদে প্রমােশন লাভ করেন। এ বছরের অক্টোবর মাসে যখন তৎকালীন পূর্ব বাংলায় নির্বাচনী হৈচৈ শুরু হয়ে গেছে, তখন পাকিস্তানের। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তাকে সেকেন্ডমেন্ট’-এ পাঠানাে হয় আবুধাবিতে ‘আর্মার্ড। রেজিমেন্ট-এর অন্যতম কমান্ডার হিসাবে। সৈয়দ ফারুক রহমানের মাতুলালয় হচ্ছে বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার জামালপুরে। মায়ের দিক দিয়ে ফারুক মুজিবনগর সরকারের এককালীন সংস্থাপন সচিব নুরুল কাদের ঝিলু এবং স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে মুজিব মন্ত্রীসভা থেকে তাজউদ্দিনের পদত্যাগের পর নয়া অর্থমন্ত্রী ডক্টর আজিজুর রহমান মল্লিকের নিকটআত্মীয়। আবুধাবিতে থাকাকালীন অবস্থায় ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে হঠাৎ করে ফারুকের নামে কোলকাতা থেকে একটা চিঠি এসে হাজির। চিঠি লিখেছেন তার নিকটআত্মীয় ও নির্বাসিত মুজিবনগর সরকারের সংস্থাপন সচিব নুরুল কাদের খান ঝিলু। বিষয়বস্তু হচ্ছে, পূর্ব বাংলায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভয়াবহ গণহত্যা এবং | নির্বাসিত মুজিবনগর সরকারের সার্বিক তত্ত্বাবধানে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের বিবরণ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের তখন সমাপ্তি পর্যায়ে। ১৯৭১ সালের ১২ই নভেম্বর ক্যাপ্টেন সৈয়দ ফারুক রহমান বিমান যােগে বৈরুত হয়ে চলে গেলেন লন্ডনে। এখানেই তার পরিচয় হলাে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর মাধ্যমে সানডে টাইমস পত্রিকার প্রখ্যাত সাংবাদিক এ্যান্থনী ম্যাসকার্নহাস-এর সঙ্গে। ১৯৭৬ সালের আগস্ট মাসে ‘আইটিভি’র ওয়ার্ল্ড ইন অ্যাকশন অনুষ্ঠানে সাক্ষাৎদানকালে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার আর এক দাবিদার হচ্ছে মেজর আব্দুর রশিদ। পুরাে নাম খন্দকার আব্দুর রশিদ।

জন্ম ১৯৪৬ সালে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার ছয়ফরিয়া গ্রামে। পিতা ছিলেন। প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক এবং গ্রামীণ গৃহস্থ। মায়ের দিক দিয়ে খন্দকার রশিদ হচ্ছেন একই দাউদকান্দি উপজেলার সন্তান ও বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ খন্দকার মােশতাক আহম্মদের দূর সম্পর্কে আত্মীয়। তরুণ রশিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে শিক্ষা অসমাপ্ত রেখেই ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে যােগদান করেন। পাঞ্জাবের রিসালপুর মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে ট্রেনিং-এর সময় তার পরিচয় হয় এক ব্যাচ সিনিয়র ক্যাডেট ফারুকের সঙ্গে। অচিরেই দুজনের মধ্যে গড়ে উঠে নিবিড় সখ্যতা। ট্রেনিং সমাপ্তির পর ফারুকের পােস্টিং হয় শিয়ালকোটে ল্যানসার্স রেজিমেন্ট-এ। আর ছ’মাসের ব্যবধানে রশিদের পােস্টিং সীমান্ত প্রদেশের বানুতে অবস্থানরত সেকেন্ড ফিল্ড আর্টিলারিতে। ১৯৬৮ সালের কথা। খন্দকার রশিদ তখন সবেমাত্র সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট থেকে ক্যাপ্টেন হিসাবে প্রমােশন পেয়েছেন। বাৎসরিক ছুটিতে দেশে এলেন। উদ্দেশ্য বিবাহ। ঢাকা ও কুমিল্লাতে বেড়াবার পর রশিদ যখন বন্দরনগরী চট্টগ্রামে তখন তার বিয়ের কথাবার্তা হলাে বিশিষ্ট শিল্পপতি এস.এইচ.খানের জ্যেষ্ঠ কন্যা টিংকুর সঙ্গে। অচিরেই বিবাহ সম্পন্ন হলে ক্যাপ্টেন রশিদ সস্ত্রীক চলে যান। কর্মস্থল বানুতে।
এস,এইচ,খানের বড় ভ্রাতা হচ্ছেন প্রখ্যাত শিল্পপতি এ. কে. খান। এই আবুল কাসেম খান ছিলেন এককালে পাকিস্তানের ফৌজি প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান মন্ত্রীসভার শিল্পমন্ত্রী। আবার এ. কে. খান-এর জামাই হচ্ছেন চট্টগ্রামের শিল্পপতি ও আওয়ামী লীগের দক্ষিণপন্থী উপদলীয় অন্যতম নেতা এম, আর, সিদ্দিকী। এখানে উল্লেখ্য যে, বঙ্গবন্ধু হত্যার পরও জনাব সিদ্দিকী আরও বছর কয়েক পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত ছিলেন। খন্দকার মােশতাক আহম্মদের দূর সম্পর্কে আত্মীয় খন্দকার রশিদের বৈবাহিক সূত্রে এভাবেই সৃষ্টি হলাে ‘হাই কানেকশন।’ ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে খন্দকার রশিদ ছুটিতে সপরিবারে এলেন যুদ্ধ বিধ্বস্ত পূর্ব বাংলায়। একদিকে হানাদার বাহিনীর হামলা আর অন্যদিকে মুক্তিযােদ্ধাদের পাল্টা আক্রমণে জনজীবন দারুণভাবে বিপর্যস্ত। দাউদকান্দির ছােট্ট ছয়ফরিয়া গ্রামে থাকা একেবারে অসম্ভব। তাই খন্দকার রশিদ সপরিবারে হাজির হলেন চট্টগ্রামে বিত্তশালী শ্বশুর বাড়িতে। তার ভায়রা এম, আর, সিদ্দিকী এপ্রিল মাস থেকে মুজিবনগরে। স্ত্রী ও দুই কন্যাকে চট্টগ্রামে কিছুটা নিরাপদ হেফাজতে রেখে ক্যাপ্টেন খন্দকার রশিদ পাড়ি জমালেন ভারতের আগরতলায়। সেদিনের তারিখটি হচ্ছে ১৯৭১ সালের ২৯শে অক্টোবর। | তখন মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায় এবং মুজিবনগর সরকারের তত্ত্বাবধানে ১১টি সেক্টর ছাড়াও জিয়াউর রহমানের কমান্ডে ‘জেড’ ফোর্স, শফিউল্লাহর কমান্ডে “এস” ফোর্স এবং খালেদ মােশাররফ-এর কমান্ডে “কে” ফোর্স-এর জন্ম হয়েছে। এছাড়াও স্থানীয়ভাবে গঠিত টাঙ্গাইলে কাদেরিয়া বাহিনী, গফরগাও-এ আফসান বাহিনী, মানিকগঞ্জে হালিম বাহিনী, গােপালগঞ্জে ‘হেমায়েত বাহিনী’র মতাে বহু সংখ্যক বাহিনী দারুণভাবে তৎপর হয়ে উঠেছে।
এদিকে স্বাভাবিকভাবেই সীমান্তের ওধারে ভারতীয় সহযােগিতায় ক্যাপ্টেন রশিদ যােগ দিলেন তৎকালীন লে. কর্নেল জিয়াউর রহমানের “জেড” ফোর্সে। সপ্তাহ কয়েক প্রয়ােজনীয় প্রশিক্ষণ ইত্যাদির পর ক্যাপ্টেন রশিদ যখন তার সর্ব প্রথম অ্যাকশন-এর জন্য সিলেট সীমান্ত দিয়ে রণাঙ্গনে প্রবেশ করে, তখন ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ। তবে এ সময় জেড ফোর্সের যে ব্যাটারির সঙ্গে রশিদ যুক্ত ছিল সেটাই স্বাধীনতা পরবর্তীকালে দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্ট-এ উন্নীত হয় এবং প্রমােশন লাভের পর মেজর খন্দকার আব্দুর রশিদ হলেন সেই রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের প্রথমার্ধে ঢাকায় আবার দুই বন্ধু ফারুক আর রশিদের দেখা হলাে। সামরিক বাহিনীর চাকুরিতে ফারুক এক বছরের সিনিয়র সত্ত্বেও তখন পর্যন্ত অবিবাহিত। অথচ রশিদের বিবাহিত জীবন হচ্ছে ১৯৬৮ সাল থেকে। শেষ পর্যন্ত খন্দকার রশিদের প্রচেষ্টায় ১৯৭২ সালের আগস্ট মাস নাগাদ স্বীয় শ্যালিকার সঙ্গে ফারুকের বিবাহ সম্পন্ন হলাে। এভাবে দুই বন্ধু পরিণত হলেন দুই ভায়রা ভাই-এ।